
প্রতিবেদন: বিশেষ অনুসন্ধানী টিম
গজারিয়া-সোনারগাঁ মেঘনায় অবৈধ নৌযান, তেল কারবার ও অনুমোদনহীন ক্রেনের অভিযোগ
নৌপথে বাড়ছে ঝুঁকি, নজরদারি ও অভিযান জোরদারের দাবি
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া ও নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মধ্যবর্তী মেঘনা নদীর গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অবৈধ নৌযান চলাচল, জ্বালানি তেল চোরাকারবার এবং অনুমোদনহীন ক্রেন দিয়ে পণ্য ওঠানো-নামানোর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় নৌযান শ্রমিক, মাঝি ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে কিছু নৌযান চলাচল ও অবস্থান করছে। একই সঙ্গে তেলবাহী নৌযান থেকে অবৈধভাবে জ্বালানি তেল স্থানান্তর এবং বিভিন্ন পণ্য লোড-আনলোডের কার্যক্রম চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, দিনের পাশাপাশি রাতের বেলায় নদীর নির্জন অংশে ছোট নৌযানের মাধ্যমে তেল স্থানান্তরের কার্যক্রম চালানো হয়। তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে কারা জড়িত এবং সংশ্লিষ্ট নৌযানগুলোর বৈধ কাগজপত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের বিষয়।
নৌপথে অবৈধ নৌযানের অভিযোগ
মেঘনা নদী দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। গজারিয়া ও সোনারগাঁ অংশে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহনের জন্য প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক কার্গো, বাল্কহেড, লাইটার ও অন্যান্য নৌযান চলাচল করে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এর মধ্যে কিছু নৌযান দীর্ঘ সময় নদীতে নোঙর করে রাখায় স্বাভাবিক নৌ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সম্প্রতি মেঘনা সেতুর দুই পাশে নৌযান এলোপাতাড়ি নোঙর করে রাখার কারণে নৌপথ সংকুচিত হওয়ার অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাতে নৌযান চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তেল চোরাকারবারের অভিযোগ
মেঘনার বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেল চুরি ও অবৈধভাবে পরিবহনের ঘটনা এর আগেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে উঠে এসেছে।
২০২৬ সালের এপ্রিলে মেঘনা নদীর ভোলার অংশে কোস্ট গার্ড প্রায় ৪ হাজার লিটার অবৈধ জ্বালানি তেল জব্দ করে। একই মাসে হাতিয়ায় মেঘনা নদীতে প্রায় ৬ হাজার ৮১৫ লিটার জ্বালানি তেলসহ চারজনকে আটক করার খবরও প্রকাশিত হয়।
এসব ঘটনার পর গজারিয়া-সোনারগাঁ অংশেও তেলবাহী নৌযান থেকে অবৈধভাবে তেল স্থানান্তর বা বিক্রির কোনো চক্র সক্রিয় আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তেল চোরাকারবারে ব্যবহৃত নৌযানগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত তদারকি করা না হলে নদীপথে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করা কঠিন হবে।
অনুমোদনহীন ক্রেন দিয়ে লোড-আনলোডের অভিযোগ
মেঘনার গজারিয়া ও সোনারগাঁ অংশের বিভিন্ন এলাকায় নৌযান থেকে মালামাল ওঠানো-নামাতে ক্রেন ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, কোথাও কোথাও প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তা যাচাই ছাড়াই ক্রেন ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ক্রেনের মালিকানা, পরিচালনার অনুমতি, অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট ঘাট বা লোড-আনলোড পয়েন্টের বৈধতা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
অনুমোদনহীনভাবে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নদীতে লোড-আনলোড করা হলে নৌযান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
বিআইডব্লিউটিএর সংক্ষিপ্ত অবস্থান
নৌপথের স্বাভাবিক চলাচল, নদীবন্দর ও ঘাট ব্যবস্থাপনা এবং নৌপথের শৃঙ্খলা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব রয়েছে। অবৈধ স্থাপনা ও নৌপথ দখলের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার নজিরও রয়েছে। সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদীর তীর থেকে সম্প্রতি ১৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান হলো, নৌপথে অবৈধ দখল, অননুমোদিত স্থাপনা কিংবা নৌ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নৌ পুলিশের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য
নৌপথে অপরাধ, অবৈধ নৌযান চলাচল এবং সন্দেহজনক নৌযানের কর্মকাণ্ড নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বে থাকা নৌ পুলিশ বলছে, অভিযোগ পাওয়া গেলে বা অপরাধের তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী তল্লাশি ও অভিযান পরিচালনা করা হয়।
বিশেষ করে রাতের বেলায় সন্দেহজনক নৌযান, তেল স্থানান্তর এবং অবৈধ পণ্য পরিবহনের বিষয়ে নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
কোস্ট গার্ডের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য
নদীপথে চোরাচালান, অবৈধ পণ্য পরিবহন ও জ্বালানি তেলের অবৈধ কারবার প্রতিরোধে কোস্ট গার্ড নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে থাকে। মেঘনা নদীর অন্যান্য অংশে অবৈধ জ্বালানি তেল জব্দের ঘটনাও তার প্রমাণ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে সন্দেহজনক নৌযানে অভিযান চালিয়ে অবৈধ পণ্য বা জ্বালানি তেল পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য
বাংলাদেশ নৌপরিবহন অধিদপ্তর একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা। অভ্যন্তরীণ নৌযান ও সমুদ্রগামী জাহাজের নিরাপত্তা, পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ, নৌযানের সার্ভে, নিবন্ধন ও সংশ্লিষ্ট সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে সংস্থাটির দায়িত্ব রয়েছে।
তাই অভিযোগের আওতায় থাকা নৌযানগুলোর নিবন্ধন, সার্ভে, ফিটনেস ও প্রয়োজনীয় সনদ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো নৌযান নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালিত হলে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে কার অনুমতিতে চলছে এসব কার্যক্রম?
স্থানীয়দের প্রধান প্রশ্ন, মেঘনার মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে—
কার অনুমতিতে নৌযানগুলো দীর্ঘ সময় নোঙর করে থাকছে?
কোন নৌযান বৈধ এবং কোনটি অবৈধ, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা হচ্ছে কি না?
নৌযান থেকে তেল স্থানান্তরের বৈধ কাগজপত্র রয়েছে কি না?
যেসব স্থানে ক্রেন দিয়ে পণ্য ওঠানো-নামানো হচ্ছে, সেসব পয়েন্টের অনুমোদন আছে কি না?
নদীতে ব্যবহৃত ক্রেনগুলোর নিরাপত্তা ও বৈধতা কে যাচাই করছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সংশ্লিষ্ট নৌযান, ঘাট, ক্রেন এবং তেল পরিবহন কার্যক্রমের নথিপত্র যাচাই করা জরুরি।
নৌদুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে
মেঘনা নদীর সোনারগাঁ অংশে সাম্প্রতিক সময়ে নৌদুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটেছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বৈদ্যেরবাজার এলাকায় মেঘনা নদীতে ট্রলারডুবির ঘটনায় তিনজনের মরদেহ উদ্ধার এবং একজন নিখোঁজ থাকার খবর প্রকাশিত হয়। ওই ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ড, বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ পুলিশ যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালায়।
ফলে নদীতে অবৈধ নৌযান, অপরিকল্পিত নোঙর, অননুমোদিত লোড-আনলোড এবং রাতের বেলায় সন্দেহজনক নৌযানের চলাচল থাকলে তা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় নৌযান চালকরা।
প্রয়োজন সমন্বিত অভিযান
স্থানীয়দের দাবি, শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, গজারিয়া ও সোনারগাঁ অংশের মেঘনা নদীতে সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে—
- নৌযানের নিবন্ধন ও ফিটনেস যাচাই;
- রুট পারমিট ও প্রয়োজনীয় সনদ পরীক্ষা;
- সন্দেহজনক তেলবাহী নৌযানে তল্লাশি;
- অবৈধ তেল স্থানান্তরের পয়েন্ট শনাক্ত;
- অনুমোদনহীন ক্রেন ও ঘাট চিহ্নিত;
- নদীতে অবৈধভাবে নোঙর করা নৌযান সরানো;
- রাতের বেলায় নৌ টহল বাড়ানো;
- অবৈধ লোড-আনলোড পয়েন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা;
- তেল চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা
নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
শেষ কথা
মেঘনা নদীর গজারিয়া-সোনারগাঁ অংশ শুধু স্থানীয় যোগাযোগের নৌপথ নয়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও পণ্য পরিবহন নেটওয়ার্কের অংশ। ফলে এখানে অবৈধ নৌযান চলাচল, জ্বালানি তেল চোরাকারবার কিংবা অনুমোদনহীন লোড-আনলোড কার্যক্রমের অভিযোগ থাকলে তা দ্রুত যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নৌযানের কাগজপত্র, তেল পরিবহনের চালান, ক্রেন ও ঘাটের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি পর্যালোচনা করা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
চেয়ারম্যান: মো. আল আমীন ,সহ সম্পাদক: মো. এনামুল হক ,প্রধান প্রতিবেদক: তানভীর সিদ্দিকী
ঠিকানা: হোল্ডিং-৩৩৯, দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী, ফরিদাবাদ, ঢাকা- ১২০৪।
Copyright © 2026 ANEWS24. All rights reserved.