
মানুষ অসুস্থ হলে নিজের কষ্টের কথা বলতে পারে। কোথায় ব্যথা, কী সমস্যা-তা চিকিৎসককে জানানো সম্ভব। তবে কোনো পশুপাখি অসুস্থ হলে তারা সরাসরি মুখের ভাষায় বলতে পারে না। আমরা সাধারণ হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগলসহ যেসব পশুপাখি নিজেরা সরাসরি পালন করি, তাদের দিকে একটু খেয়াল রাখলেও কুকুর ও বিড়ালসহ আরও কিছু প্রাণী আছে, যাদের স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের কোনো সচেতনতা নেই।
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় অতিরিক্ত গরম, বর্ষার জলাবদ্ধতা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও বিভিন্ন সংক্রমণ প্রাণীদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। এছাড়া খাবারের অনিশ্চয়তা, দুর্ঘটনা, মানুষের নির্যাতন এবং চিকিৎসার অভাব তাদের জীবনকে প্রতিদিনই কঠিন করে তোলে। প্রাণীরা মানুষের মতো কথা বলতে পারে না, তাই কোনো প্রাণী অসুস্থ হলে তাদের আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলেই সতর্ক হওয়া জরুরি। খাবার না খাওয়া, অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ থাকা, বারবার বমি বা পাতলা পায়খানা, শরীরে ক্ষত, চোখ-নাক দিয়ে পানি পড়া, শ্বাসকষ্ট কিংবা চলাফেরায় সমস্যা- এসবই অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে।
নিজেদের পালিত কোনো প্রাণী অসুস্থ হলে আমরা সহজেই চিকিৎসার বিষয়ে খেয়াল করি না। আমরা ভাবি, তারা প্রাকৃতিকভাবেই সুস্থ হয়ে উঠবে। আর তাদের অসুস্থতাকে সব সময় অবহেলার চোখে দেখি। যখন তাদের অবস্থা গুরুতর হয়, তখন চিকিৎসা দেওয়া হয়। এতে অনেক প্রাণী মারাও যায়। এতে প্রাণীর প্রাণহানির পাশাপাশি আমরাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হই।
অন্যদিকে, নিজেদের পালিত প্রাণীর প্রতি একটু খেয়াল রাখলেও কুকুর ও বিড়ালসহ আমাদের আশপাশে থাকা অন্য প্রাণীদের অসুস্থতা নিয়ে কোনো চিন্তা করি না। গ্রাম বা শহর- দেশের সব জায়গায় অসংখ্য কুকুর ও বিড়াল মানুষের সঙ্গে বসবাস করছে। তাদের অনেকের কোনো মালিক নেই, নেই নির্দিষ্ট আশ্রয়ও। দিনের পর দিন তারা বাসাবাড়ি, রাস্তা, ফুটপাত কিংবা দোকানের সামনে রাত কাটায়।
একটু খাবারের জন্য তাদের বাড়ি বাড়ি, রাস্তা বা ডাস্টবিন থেকে ডাস্টবিনে ঘুরতে হয়। সেখানে পচা খাবারের সঙ্গে প্লাস্টিক, কাচ কিংবা অন্যান্য ক্ষতিকর জিনিসও থাকে। ক্ষুধার তাড়নায় এসব খেতে গিয়ে অনেক প্রাণী অসুস্থ হয়ে পড়ে। আবার যানবাহনের ধাক্কায় আহত হয়। কখনো কোনো পথকুকুরের শরীরে গভীর ক্ষত দেখা যায়, কোনো বিড়ালের চোখে জমে থাকে সংক্রমণের চিহ্ন। আমরা পাশ দিয়ে হেঁটে যাই, কেউ কেউ হয়তো কয়েক সেকেন্ড তাকাই, তারপর আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।
প্রাণীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে কথা বলেছেন ইন্টার্ন ভেটেরিনারিয়ান মো. লিখন ইসলাম। তিনি বলেন, ‘একজন ভেটেরিনারিয়ান হিসেবে প্রতিদিনই আমাদের আশপাশে এমন অসংখ্য প্রাণী দেখি, যাদের অসুস্থতা, ক্ষুধা কিংবা যন্ত্রণা দেখার মতো কেউ নেই। রাস্তার পাশে আহত হয়ে পড়ে থাকা একটি কুকুর খাবারের আশায় মানুষের পেছনে ঘুরতে থাকা, একটি বিড়াল কিংবা মালিকের অবহেলায় অসুস্থ হয়ে পড়া কোনো প্রাণী-তাদের কষ্ট অনেক সময় আমাদের চোখের সামনেই থাকে, অথচ আমরা নির্বিকারভাবে পাশ কাটিয়ে যাই।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা হয়তো প্রতিটি প্রাণীর দায়িত্ব নিতে পারব না, কিন্তু তাদের প্রতি একটু সহমর্মী হতে পারি। সামান্য খাবার বা পানি দেওয়া, আহত প্রাণীকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেওয়া কিংবা অন্তত তাকে আঘাত না করাও অনেক বড় মানবিকতা। এতে জুনোটিক রোগব্যাধি (যা প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়) যেমন প্রতিরোধ করা যাবে, তেমনি ওয়ান হেলথের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে। আমরা একটি সাম্যের পৃথিবী বাস্তবায়ন করতে পারব।’
প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা শুধু তাদের খাবার দেওয়া কিংবা আদর করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তাদের সুস্থতা, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করাও আমাদের দায়িত্ব। শুধু কুকুর-বিড়াল নয়, আমাদের চারপাশের পাখিদের স্বাস্থ্য নিয়েও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।