1. admin@anews24.tv : ANEWS24 TV : ANEWS24 TV
৩০ হাজারে শুরু, হাঁসের খামার-ইনকিউবেটরে দিলরুবার আয় মাসে চার লাখ টাকা - ANEWS24
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৯ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
ফতুল্লায় সংবাদ প্রকাশের জেরে: সাংবাদিক রাসেল কে হত্যার হুমকি থানায় অভিযোগ আগামী ১০ বছরেও শেখ হাসিনার ফেরার সম্ভাবনা নেই: স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ খুলনায় পৌঁছেছেন প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমান সবাইকে নিয়ে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন প্রধানমন্ত্রী ওসমানী উদ্যানে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কখন পদত্যাগের ঘোষণা দেবেন, জানালেন ইশরাক লালমনিরহাট সীমান্তে ১৪ জনকে পুশ ইনের চেষ্টা রুখে দিল বিজিবি মেট্রো রেলের প্যাকেজ-৩ চলতি মাসে চার স্টেশনে ইউটিলিটি স্থানান্তর শুরু বাংলাদেশ আমাদের পথ দেখিয়েছে : নেহা বোরা ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে ৭ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৩২৭

৩০ হাজারে শুরু, হাঁসের খামার-ইনকিউবেটরে দিলরুবার আয় মাসে চার লাখ টাকা

রিপোর্টার
  • আপডেট সময় : রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৯৭ বার পঠিত

একাধিক উদ্যোগে লোকসান, তবু দমে যাননি মেহেরপুরের দিলরুবা খাতুন। মাত্র ৩০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ১০০টি হাঁসের বাচ্চা দিয়ে শুরু করেন খামার। তিন বছরের ব্যবধানে সেই খামারে এখন প্রায় এক হাজার হাঁস। পাশাপাশি ইনকিউবেটরে প্রতি সপ্তাহে উৎপাদন করছেন প্রায় দুই হাজার হাঁসের বাচ্চা। হাঁস পালন ও বাচ্চা বিক্রি থেকে সব খরচ বাদ দিয়ে বর্তমানে মাসে প্রায় চার লাখ টাকা আয় করছেন এই নারী উদ্যোক্তা।

দিলরুবার এই সাফল্যের গল্প শুধু একজন নারীর স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার কাহিনি নয়; বরং প্রতিকূলতা জয় করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পাশাপাশি অন্যদের উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখানোর গল্পও।

দিলরুবা খাতুনের উদ্যোক্তা জীবনের শুরুটা অবশ্য এতটা মসৃণ ছিল না। প্রথমে তিনি বাজরিকা পাখি পালন শুরু করেন। কিন্তু করোনাকালে লোকসানের মুখে পড়ে সেই উদ্যোগে ধাক্কা খান। এরপর নতুন আশায় ব্রয়লার মুরগির খামার গড়ে তোলেন। কিন্তু সেখানেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় বার্ড ফ্লু। ধারাবাহিক ক্ষতিতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নিজের উদ্যোগ গড়ে তোলার স্বপ্ন থেকে সরে আসেননি তিনি।

শেষ পর্যন্ত বিকল্প হিসেবে হাঁস পালনের সিদ্ধান্ত নেন দিলরুবা। প্রায় তিন বছর আগে মাত্র ৩০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে পিকিং স্টার-১৩ জাতের ১০০টি হাঁসের বাচ্চা কেনেন। সীমিত পুঁজি নিয়ে শুরু হয় তার নতুন পথচলা। নিয়মিত পরিচর্যা, পরিশ্রম ও ধৈর্যের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে খামার। একসময় ছোট পরিসরে শুরু করা সেই উদ্যোগই পরিণত হয় সম্ভাবনাময় খামারে। বর্তমানে তার খামারে হাঁসের সংখ্যা প্রায় এক হাজার।

দিলরুবার সাফল্যের পেছনে রয়েছে শুধু হাঁস পালন নয়, উৎপাদিত বাচ্চার চাহিদাকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও। খামারের পাশেই তিনি স্থাপন করেছেন হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের জন্য একটি ইনকিউবেটর, যার ধারণক্ষমতা ৩৬ হাজার ডিম। এই যন্ত্রের মাধ্যমে নিয়মিত হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করছেন তিনি। বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে প্রায় দুই হাজার বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে। চাহিদা থাকায় এসব বাচ্চা মেহেরপুরের বাইরেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে।

ফলে তার উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে আয়ের নতুন উৎস। একদিকে খামারে হাঁস পালন, অন্যদিকে ইনকিউবেটরের মাধ্যমে বাচ্চা উৎপাদন ও বিক্রি- দুই ক্ষেত্র থেকেই আয় করছেন তিনি। সব মিলিয়ে বর্তমানে মাসে খামারের খাবার, শ্রমিক, বিদ্যুৎ, ওষুধ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বাদ দিয়ে প্রায় চার লাখ টাকা আয় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এই নারী উদ্যোক্তা।

দিলরুবা খাতুন জানান, শুরুতে একাধিক উদ্যোগে লোকসান হওয়ায় হতাশ হয়েছিলেন। তবে তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অল্প পুঁজি দিয়ে হাঁস পালন শুরু করলেও ধীরে ধীরে খামার বড় করার পরিকল্পনা করেন। এখন হাঁসের বাচ্চার চাহিদা থাকায় উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে খামার আরও সম্প্রসারণ করতে চান তিনি।

দিলরুবার এই উদ্যোগে সহযোগিতা করছেন তার স্বামী ও ছেলে। পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যাচ্ছে খামারের কার্যক্রম। হাঁসের পরিচর্যা, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও বাচ্চা সরবরাহের বিভিন্ন কাজে তারা তাকে সহযোগিতা করেন। পরিবারের এই সহযোগিতা তার উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখছে।

ছেলে বাঁধন বলেন, মায়ের এই সফলতার পেছনে রয়েছে অনেক পরিশ্রম, ত্যাগ আর ধৈর্যের গল্প। শুরুতে কয়েকটি উদ্যোগে লোকসান হওয়ায় তাকে অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। মাত্র ৩০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ১০০টি হাঁসের বাচ্চা দিয়ে খামার শুরু করেন। ধীরে ধীরে সেই উদ্যোগ আজ বড় পরিসরে পৌঁছেছে। এখন হাঁস পালন ও ইনকিউবেটরের মাধ্যমে বাচ্চা উৎপাদন করে তিনি সফলতা অর্জন করেছেন। আমি এবং আমার বাবা তাকে বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করি। তার এই অগ্রযাত্রা আমাদের পরিবারের জন্য গর্বের বিষয়। আমরা চাই, মায়ের এই উদ্যোগ আরও বড় হোক এবং তার খামারের মাধ্যমে অন্যরাও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাক।

স্বামী সেলিম হোসেন জানান, স্ত্রীর এই সফলতার পেছনে রয়েছে অনেক পরিশ্রম, ধৈর্য ও অধ্যবসায়। শুরুতে কয়েকটি উদ্যোগে লোকসান হওয়ায় সে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু কখনো হাল ছাড়েনি। মাত্র ৩০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ১০০টি হাঁসের বাচ্চা দিয়ে নতুন করে পথচলা শুরু করে। আজ তার খামার ও ইনকিউবেটরের মাধ্যমে বাচ্চা উৎপাদনের উদ্যোগ অনেক বড় হয়েছে। আমি সব সময় তাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। তার এই সাফল্যে আমি গর্বিত।

দিলরুবার খামার থেকে হাঁসের বাচ্চা সংগ্রহ করে নতুন করে হাঁস পালনে আগ্রহী হচ্ছেন অন্য উদ্যোক্তারাও। তুলনামূলক ছোট পরিসরে শুরু করার সুযোগ থাকায় অনেকের কাছেই হাঁস পালন হয়ে উঠছে বিকল্প আয়ের সম্ভাবনা।

নতুন উদ্যোক্তা সাজবুল ইসলাম রনি জানান, দিলরুবা খাতুনের হাঁসের খামার দেখে আমি নতুন করে হাঁস পালন ও উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়ে আগ্রহী হয়েছি। মাত্র ৩০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করে তিনি যেভাবে সফলতা অর্জন করেছেন, তা আমাদের মতো নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অনুপ্রেরণা। তাঁর খামার থেকে হাঁসের বাচ্চা সংগ্রহের সুযোগ থাকায় উদ্যোগ শুরু করাও সহজ হচ্ছে। তবে সফল হতে হলে হাঁসের সঠিক পরিচর্যা, মানসম্মত খাবার, রোগ প্রতিরোধ এবং বাজার সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকা জরুরি। আমি চাই, তার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে। সরকারি প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেলে আমাদের মতো নতুন উদ্যোক্তারা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবেন বলে আশা করি।

আরেক উদ্যোক্তা হায়াত আলী জানান, দিলরুবা খাতুনের হাঁসের খামার ও বাচ্চা উৎপাদনের উদ্যোগ আমাদের মতো উদ্যোক্তাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। অল্প পুঁজি নিয়ে শুরু করে তিনি যেভাবে নিজের উদ্যোগকে বড় করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার খামারে আধুনিক ইনকিউবেটরের মাধ্যমে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন হওয়ায় নতুন খামারিরা সহজেই বাচ্চা সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছেন। আমিও মনে করি, হাঁস পালন গ্রামীণ মানুষের স্বাবলম্বী হওয়ার একটি সম্ভাবনাময় মাধ্যম।

ইনকিউবেটর মেশিন নিয়ন্ত্রণকারী টেকনিশিয়ান মওলা বক্স জানান, এই ইনকিউবেটর মেশিনের মাধ্যমে নিয়মিত হাঁসের ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদন করা হয়। মেশিনের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও ডিমের সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য ত্রুটি হলে ডিম থেকে বাচ্চা ফোটার হার কমে যেতে পারে। তাই নিয়মিত মেশিনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে হয়। বর্তমানে এখানে প্রতি সপ্তাহে প্রায় দুই হাজার হাঁসের বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে। এসব বাচ্চা মেহেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার খামারিরা সংগ্রহ করছেন। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে অল্প সময়ে বেশি বাচ্চা উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যা অব্যাহত রাখতে পারলে এই উদ্যোগ আরও সম্প্রসারিত হবে এবং নতুন খামারিদের হাঁস পালনে উৎসাহ জোগাবে বলে আমি মনে করি।

মেহেরপুর জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, এ জেলায় হাঁস পালনের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। গ্রামীণ পরিবেশ, উদ্যোক্তাদের আগ্রহ এবং বাজারে হাঁস ও হাঁসের বাচ্চার চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে এ খাতকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, হাঁস পালন লাভজনক উদ্যোগে পরিণত হতে পারে, যদি খামারিরা সঠিক নিয়মে পালন করেন এবং রোগ প্রতিরোধে সচেতন থাকেন। নতুন উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, খামার ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় কারিগরি বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে হাঁস পালন করা গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখা সম্ভব।
মাত্র ৩০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ১০০টি হাঁসের বাচ্চা দিয়ে শুরু করা উদ্যোগ আজ প্রায় এক হাজার হাঁস ও আধুনিক ইনকিউবেটরনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় পৌঁছেছে। তার এই পথচলা দেখিয়ে দিচ্ছে, সঠিক পরিকল্পনা, পরিশ্রম, ধৈর্য ও পরিবারের সহযোগিতা থাকলে সীমিত পুঁজি নিয়েও গড়ে তোলা সম্ভব সম্ভাবনাময় উদ্যোগ।

এ ক্যাটাগরীর অন্যান্য খবর..